অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিত বিবাহ হবে না।
হযরত আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন,
=> রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, সাবালিকা (অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক মেয়ে) তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তার সে বিয়ে বাতিল। তিনি একথাটি তিনবার বলেছেন। আর সে (স্বামী) যদি তার সাথে সহবাস করে, তাহলে এজন্য তাকে মোহর দিতে হবে। যদি উভয় পক্ষের (অভিভাবকদের) মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে শাসক তার অভিভাবক হবেন। কারণ যাদের অভিভাবক নেই তার অভিভাবক হবেন শাসক।
(সুনানে আবু দাউদ। হাদিস: নং ২০৮৩)
এই হাদীসটা সম্পৰ্কে কয়েকটা মতবিরোধ হলোঃ
عن ابن جريج أنه سأل الزاهري عن هذا الحديث فلم يعرفه
একদা ইবনে জুরাইজ (রহ.) এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম ইবনে শিহাব জুহরী (রাহঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন ইমাম জুহরি উত্তর দিলেন যে, তিনি এই হাদীসটি জানেন না।
আর, এই হাদিসটির মধ্যেই একজন রাবী হচ্ছেন ইমাম জুহরী রাহঃ। উনি নিজেই যেহেতু হাদীসটি সম্পৰ্কে জানেন না, তাহলে হাদীস সহীহ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
আবার, আরেকটি সনদের
وَحَجَّاجُ بْنُ أَرْطَاةَ , فَلَا يُثْبِتُونَ لَهُ سَمَاعًا عَنِ الزُّهْرِيِّ ,
হাজ্জাজ বিন আরত্বাহ এর শ্ৰবণ ইমাম যুহরীর রহ. থেকে প্ৰমাণিত হয়নি, তাই অত্র বর্ণনা মুনকাত্বী।
( মুসনাদে আহমাদ، পৃষ্ঠা: ৪০/২৪৩. শরহু মা‘আনিয়াল আছার লিত তহাবী, পৃষ্ঠাঃ ৩/০৭ )
এছাড়াও উপরের সনদের ইমাম যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করা রাবী “সুলাইমান ইবনে মূসা” হলো “মুনকারুল হাদীস” এবং “মুদাল্লিস” রাবী।
দেখুন: তারিখুল কাবীর ৪/৩৯ রাবী নং ১৮৮৮, ঈলালে তিরমিজী কাবীর, পৃষ্ঠা ২৫৬, হাদীস নং ৪৬৩, সিয়ারু আ‘লামুন নুবালা: ৬/১৫৪, রাবী নং ৮০৮, তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ২৬১৬, যুয়াফা ওয়াল মাতরূকীন লিন নাসাঈ: পৃষ্ঠা ৪৯, রাবী নং ২৫২, মাশাহীরু উলামাইল আমসার পৃষ্ঠা ২৮৪, রাবী নং ১৪১৫ এবং তা’রীফু আহলিত তাকদীস বি মারাতিবিল মাওসূফীনা বিত তাদলীস, পৃষ্ঠা: ১/৬২ রাবী নং ১৫৮)
=> কিন্তু অভিবাবক ছাড়াই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায় এরকম বর্ণনা বিভিন্নভাবে এসেছেঃ
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, (সাবালিকা) মেয়ে নিজের ব্যপারে তার ওলীর (অভিবাকের) অপেক্ষা অধিক হকদার। কুমারী মেয়ের বেলায় তার বিবাহের বিষয়ে তার নিকট থেকে অনুমতি নিতে হবে। আর সে যদি চুপ থাকে তার চুপ থাকাই অনুমতি।
(তারিখে বাগদাদ: পৃঃ ২/৪৫২, ১২/৪৪০, সহিহ মুসলিম: ৩৩৬৭, আবূ দাউদ: ২০৯৮, মুয়াত্তা মালেক: ১০৮৬, সুনানে ইবনু মাজাহ: ১৮৭০, জামে তিরমিজী: ১১০৮)
এক ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ) এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, আমি এক মহিলার অভিবাবক, কিন্তু সে আমার অনুমতি ছাড়াই বিবাহ করে নিয়েছে। এমতবস্থায় আমি কী করতে পারি?? তখন আলী (রাঃ) বললেন, তুমি ভালোভাবে দেখো আসলে সে কী করেছে? যদি তার কুফু বা সমকক্ষ কাউকে বিবাহ করে, তাহলে তার জন্য (ওলী বা অভিবাবকের অনুমতি ছাড়াও) এই বিবাহ বৈধ হয়েছে। আর যদি সে কুফু বা সমপৰ্যায়ের যোগ্য স্বামী গ্ৰহণ না করে থাকে, তাহলে তার বিষয়টি তোমার (ওলী বা অভিবাবকের) নিকট ন্যাস্ত হবে।
(সুনানে দারাকুতনীঃ ৪/৩৪৩, হা/৩৫৭২)
=> হযরত সালামা বিনতে আব্দুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একদা এক মেয়ে রাসূল (সাঃ) এর কাছে আসলেন। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কতইনা উত্তম পিতা, আমার চাচাত ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল অথচ তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এমন এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন যাকে আমি পছন্দ করি না। এ ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) তার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলে পিতা বললেন, মেয়েটি সত্যই বলেছে। আমি তাকে এমন পাত্রের সাথে বিয়ে দিচ্ছি যার পরিবার ভাল না। তখন রাসূল (সাঃ) মেয়েটিকে বললেন, “এই বিয়ে হবে না, তুমি যাও এবং যাকে ইচ্ছে বিয়ে করে নাও”।
(মুসন্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ১০৩০৪, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১৫৯৫৩)
সুনানে আবু দাঊদ: ২০৯৬, ২১০১)
=> হযরত আয়েশা (রাঃ) নিজেই অভিবাবক ছাড়া বিবাহ করিয়েছিলেন-
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত:
তিনি একবার আবদুর রহমানের কন্যা হাফসাকে মুনযির ইবনু যুবায়র এর সাথে বিবাহ দিলেন। (অভিবাবক/পিতা) আবদুর রহমান তখন সিরিয়াতে ছিলেন (তাই তিনি এই বিবাহে অনুপস্থিত ছিলেন)। আবদুর রহমান যখন সিরিয়া থেকে ফিরে আসলেন (এবং এই বিবাহের সংবাদ সম্পর্কে অবগত হলেন) তখন তিনি বললেন: আমার মতো লোকের সাথে এই কাজ করা হল, আমার ব্যাপারে আমাকে উপেক্ষা করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল। অতঃপর হযরত আয়িশা (রাঃ) মুনযির ইবনু যুবায়র এর সাথে আলোচনা করলেন। মুনযির বললেন: আবদুর রহমানের হাতেই এর (এই বিবাহ বহাল রাখা বা না রাখার) ক্ষমতা রয়েছে। আবদুর রহমান বললেন: যে ব্যাপারে আপনি নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন আমি তাকে পরিবর্তন করব না, তাই হাফসা মুনযিরের কাছেই থাকলেন এবং এটি তালাক বলে গণ্য হয়নি।
(মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ১১৫৪, তহাবী শরীফ: ৪২৫৫, ৪২৫৬, ৪২৫৭ (শামেলা)
এছাড়াও হয়রত আয়েশা (রাঃ) এর মতে, ওলী বা অভিবাবক বলতে উদ্দেশ্য ছিলো “পুরুষ ব্যক্তি” আর এটা পিতা ছাড়াও যেকোনো পুরুষই হতে পারে।
হয়রত আয়েশা (রাঃ) একদিন নিজের ভাইয়ের বংশের এক মহিলার সাথে বোনের বংশের এক পুরুষের বিবাহ দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন এবং তাদের মাঝে পৰ্দা টানিয়ে তারপর কথাবাৰ্তা বলেন। এমনকী যখন বিবাহ সম্পন্ন করানোর সময় চলে আসলো, তখন তিনি জনৈক এক পুরুষ ব্যক্তিকে আদেশ করলেন উভয়ের বিবাহ দিতে। সেই পুরুষ ব্যক্তিটি বিবাহ সম্পন্ন করলেন। এরপর আয়েশা (রাঃ) বললেন, মহিলারা বিবাহ দেওয়ার অধিকারীনী নয়।
(শরহু মাআনীল আছার তহাবী, হা: ৪২৬৯)
=> বুরায়দাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
তিনি বলেন, এক যুবতী রাসূল (সঃ) এর নিকট উপস্হিত হয়ে বললেন, আমার পিতা তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে তার দুর্দশাগ্রস্ত অবস্হা থেকে উদ্ধারের জন্য আমাকে তার সাথে বিবাহ দিয়েছেন। রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) বিষয়টি মেয়েটির এখতিয়ারে ছেড়ে দেন। মেয়েটি বললো, আমার পিতা যা করেছেন তা আমি বহাল রাখলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিলো, মেয়েরা জেনে নিক যে, বিবাহের ব্যাপারে পিতাদের কোন এখতিয়ার নেই।
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাঃ ১৮৭৪)


