হোমিওপ্যাথিকের আবিষ্কারক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানী

স্যামুয়েল হ্যানিম্যান সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানী

রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষের মর্মান্তিক বেদনাকে যিনি নিজের হৃদয় দিয়ে সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি হলেন স্যামুয়েল হ্যানিম্যান। প্রচলিত চিকিৎসা বিজ্ঞানসমূহের ইতিহাস নিয়ে যারা ব্যাপক পড়াশোনা করেছেন তারা সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন যে,  তিনিই ছিলেন পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবিষ্কারক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান কেবল একজন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানী ছিলেন না, একই সাথে তিনি ছিলেন একজন মহাপুরুষ, পরমাণু বিজ্ঞানী, বহু ভাষাবিদ, আ্যাসিস্ট, অনুজীব বিজ্ঞানী, আদর্শ পিতা এবং সেই সাথে একজন রোমান্টিক প্রেমিক।

আজ থেকে ২০০ বছর পূর্বে হ্যানিম্যানের সময় এলোপ্যাথিক চিকিৎসা ছিল চরম বর্বরতার সমতুল্য।  তখনকার দিনে এলোপ্যাথিক ডাক্তাররা উচ্চ রক্তচাপ সহ অধিকাংশ রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীর শরীরে অনেকগুলো জোক লাগিয়ে দিত রক্ত কমানোর জন্য অথবা রক্ত কেটে রগ কেটে রক্ত বের করত। মানসিক রোগীকে ভূতে ধরেছে এটা মনে করে পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলত।

একটি রোগের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে 15 থেকে 20 টি ওষুধ রোগীকে একত্রে খাওয়ানো হতো এবং  অন্য কোনো সামান্য ব্যাপারেও শরীরে ছুরি চালানো হতো। হানিমান কিন্তু অন্যান্য ডাক্তারদের মতো ডাক্তারি পাস করে অর্থ উপার্জনের পেছনে লেগে যান নি, বরং চিকিৎসার নামে এসব বর্বরতা থেকে মানবজাতিকে কিভাবে মুক্ত করা যায় তা নিয়ে যুগের পর যুগ গবেষণা করেছেন।

স্যাম এন্ড হ্যানিম্যান ছিলেন একজন বিখ্যাত জার্মান চিকিৎসক এবং হোমিওপ্যাথি এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি 1755 সালের ১০ এপ্রিল জার্মানির মেইসেন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম ক্রিস্টিয়ান ফ্রেড্রিক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান।

তিনি পড়াশোনা করেন এবং মেধার পরিচয় দেন বিশেষত ভাষাবিজ্ঞানে। তিনি ইংরেজি, ফরাসি, গ্রীক, ল্যাটিন, স্প্যানিশ, এবং আরবি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মেশিনের প্রিন্স স্কুলে। ১৭৭৫ সালে তিনি লাইভজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশুনা শুরু করেন। ১৭৭৭ সালে তিনি  ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়াশোনা  করে চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে ডিগ্রি লাভ করেন। এখানে তিনি  টি.এইচ. ডি লাভ করেন। যিনি স্বাস্থ্যের উপরে চিকিৎসা জীবনে প্রথম দিকে প্রথাগত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন এবং এর রোগ নিরাময়ের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন।

 

হোমিওপ্যাথি প্রতিষ্ঠায় হ্যানিম্যানের অবদান

১. হ্যানিম্যানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির আবিষ্কার। “Similia Similibus Curentur” বা “সমরোগ সমৌষধ দ্বারা নিরাময় হয়” নীতির ভিত্তিতে তিনি এই পদ্ধতি গড়ে তোলেন।

 

২. “অর্গানন অব মেডিসিন” (Organon of Medicine) ১৮১০ সালে প্রকাশিত তার বই “The Organon of the Healing Art”-এ তিনি হোমিওপ্যাথির তত্ত্ব ও নীতিমালা তুলে ধরেন। এই বই আধুনিক হোমিওপ্যাথির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি এই বইয়ের ৬টি সংস্করণ প্রকাশ করেন, প্রতিটি সংস্করণে নতুন তত্ত্ব ও পদ্ধতি যোগ করেন।

 

৩. ডায়নামিক ডোজ তত্ত্ব হ্যানিম্যান রোগ নিরাময়ের জন্য ঔষধের ক্ষুদ্রতম ডোজ ব্যবহারের ধারণা প্রচলন করেন। তিনি মনে করতেন, শরীরে প্রয়োজনের বেশি ঔষধ প্রয়োগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। তাই তিনি মাইক্রোডোজ বা ডায়নামাইজেশন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

 

৪. মিয়াজম তত্ত্ব (Miasm Theory)। হ্যানিম্যান রোগের কারণ এবং প্রকৃতির বিষয়ে মিয়াজম তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি বলেছিলেন, ক্রনিক রোগের প্রধান কারণ তিনটি মিয়াজম (Psora, Syphilis, এবং Sycosis)।

 

৫. ঔষধ পরীক্ষার পদ্ধতি (Drug Proving)। তিনি সুস্থ মানুষের ওপর ঔষধ পরীক্ষার ধারণা চালু করেন, যা হোমিওপ্যাথির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এতে ঔষধের প্রভাব এবং এর ব্যবহার সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়।

 

৬. প্রাকৃতিক নিরাময়ের ধারণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, রোগ নিরাময় প্রাকৃতিকভাবে শরীরের ভেতর থেকে শুরু হয়। তাই তিনি চিকিৎসায় এমন ঔষধ ব্যবহার করতেন যা শরীরের নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাকে সক্রিয় করে।

 

৭. রোগীর প্রতি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি। হ্যানিম্যান রোগীকে শুধুমাত্র তার শারীরিক লক্ষণ নয়, মানসিক ও মানসিক অবস্থার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার ওপর জোর দেন।

 

৮. বিকল্প চিকিৎসার অগ্রদূত। তার কাজ কেবল হোমিওপ্যাথি নয়, বিকল্প চিকিৎসার অন্যান্য পদ্ধতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

স্যামুয়েল হানিম্যান ১৮৪৩ সালের ২রা জুলাই, প্যারিস, ফ্রান্সে মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসায় অসাধারণ আবিষ্করের জন্য তিনি এখনো চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *