“ম্যাগনাস কার্লসেন” যাকে দাবা খেলায় হারানো অকল্পনীয়

আমরা যারা সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে এক্টিভ থাকি তারা অবশ্যই এই নিউজটি দেখেছি যে, গত ১৮ জানুয়ারি রাতে নয় বছর বয়সী বাংলাদেশের এক খুদে দাবাড়ু “রায়ান রাশিদ মুগ্ধ” দাবায় ৫ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ম্যাগনাস কার্লসেনকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছেন। নরওয়ের গ্র্যান্ড মাস্টার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দাবাড়ু বলা হচ্ছে তাকে। দাবায় হারানো এতটাই কঠিন যে, অনলাইনে একটি জনপ্রিয় মিমস রয়েছে যেখানে এক পাতার একটি বইয়ের শিরোনাম” how to beat Magnus Carlson ” প্রথম পাতায় লেখা “impossible” কিন্তু কে এই ম্যাগনাস কার্লসেন  যাকে হারানো অকল্পনীয়? চলুন আজকে তার সম্পর্কে জেনে আসি।

ম্যাগনাস কার্লসেন ১৯৯০ সালের ৩০ নভেম্বর নরওয়ের টনসবার্গ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হেনরিক কার্লসেন একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং মা তর সিগরুন ওয়েবে একজন কমিস্ট। পরিবারটি কালসেনের মেধাকে উৎসাহিত করার জন্য সবসময় তাকে সমর্থন করেছিলেন । ছোটবেলায় তার বুদ্ধিমত্তার অসাধারণ দিকগুলো প্রকাশ পায়। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি 50 টুকরো জিগস পাজল সমাধান করতে সক্ষম হন এবং চার বছর বয়সে ১০০ টুকরো জিগস পাজেল সমাধান করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন দেশের পতাকা, রাজধানীর নাম এবং অন্যান্য ভূগোল সম্পর্কিত তথ্য মুখস্থ করতেন।

৬ বছর বয়সে তার বাবা তাকে দাবা খেলা শেখান, কিন্তু প্রথম দিকে তিনি এই খেলায় খুব আগ্রহী ছিলেন না। তবে বছর বয়সে তিনি দাবার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং দ্রুত উন্নতি শুরু করেন। তাকে দাবায় উৎসাহিত করার জন্য তার বাবা-মা তাকে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণ করান। তার প্রথম অর্জন আসে ১০ বছর বয়সে যখন তিনি নরওয়ের স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেন। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিশোর গ্রুপের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেন। কালসেন সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করতেন কিন্তু তার মূল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দাবা। মাত্র ১২ বছর বয়সে কার্লেসেন” চেস প্রডিসি” হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার জন্য বেশি সময় দিতে শুরু করেন। তার পরিবার থেকে পড়াশোনার পরিবর্তে দাবার প্রতি সময় দিতে উৎসাহিত করেন। এর ফলে ২০০৪ সালে ১৩ বছর  চার মাস বয়সে তিনি গ্র্যান্ড মাস্টার টাইটেল অর্জন করেন যা তাকে বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি দেয়। এরপর থেকেই তার সাফল্য যাত্রা অব্যাহত থাকে এমন এক পথ চলার প্রতীক যা পরিশ্রম কৌশলগত দক্ষতা এবং প্রতিভার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে। ২০০৪ সালে দুবাই ওপেনে তিনি দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখান এবং তার খেলা দাবার বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এছাড়া ২০০৫ সালে তিনি নরওজিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেন। ২০০৭ সালে তিনি ক্যান্ডিডেটের ম্যাচে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রমাণ করেন যে তিনি শীর্ষ দাবাড়ুদের চ্যালেঞ্জ করার জন্য প্রস্তুত। ২০১০ সালে কার্লসেন ফিদে ‌(Fide) র‍্যাংকিং বিশ্বের এক নম্বর খেলোয়াড় হন। মাত্র 19 বছর বয়সে এই কৃতিত্ব অর্জন করে তিনি ইতিহাস করেন।

২০১৩ সালে তিনি বিশ্বনাথন আনন্দকে পরাজিত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন যার মাধ্যমে তিনি আধুনিক দাবার শ্রেষ্ঠ খেলোয়ার হিসেবে স্বীকৃতি পান। ২০১৪ সালে আনন্দের সঙ্গে পুনরায় খেলেন এবং আবারো তিনি বিজয়ী হন। ২০১৬ সালের রাশিয়ার সের্গেই কারিয়াকিনকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়নশিপ ধরেন। ২০১৮ সালে মার্কিন খেলোয়াড় ফেবিয়ানো কারুয়ানার  ট্রাইবেকারে জিতে শিরোপা ধরে রাখেন। ২০২১ সালে রাশিয়ার নেপোম নিয়াচ্চিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ বজায় রাখেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব দাবার রেংকিং এ শীর্ষস্থানে রয়েছেন। তিনি রেপিড এবং  ব্লিটজ দাঁবায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন যা তাকে দাবার সব ফরমেটে শ্রেষ্ঠ দাবারু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শুধু একজন শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু নন, বরং তিনি দাবাকে প্রিয় করার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।

তিনি দাবার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। তার নামে ” play Magnus” নামে একটি দাবা অ্যাপ তৈরি হয়েছে। কালসেনের খেলার স্টাইল খুবই বহুমুখী ও কৌশলগত। তিনি অপিনিং থেকে শুরু করে এন্ড গেম পর্যন্ত বিভিন্ন নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করেন এবং তিনি খেলার মাঝখানে এমন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম যে, অপরজন নিশ্চিত হেরে যেত। তিনি অনলাইনেও দাবার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। কোভিড 19 মহামারির সময় তিনি অনলাইন দাবার টুর্নামেন্ট অংশগ্রহণ করেন এবং এগুলোকে জনপ্রিয় করার জন্য তিনি অনেক পরিশ্রম করেন। ম্যাগনাস কার্লসেন আধুনিক দাবার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং ধারাবাহিক সাফল্য তাকে দাবার ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্থান দিয়েছে। শুধু প্রতিযোগিতামূলক খেলায় নয়, দাবার প্রতি তার অবদান এই খেলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *